স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণমাধ্যমের ভূমিকা

এ এইচ এম বজলুর রহমান : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে বিজ্ঞান মনস্কতা এবং বিজ্ঞান শিক্ষা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের উপর গুরুত্ব প্রদান করে নানামুখী কর্মকাণ্ডের সূত্রপাত শুরু করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সাল, ২০১৪ সাল, ২০১৮ সাল এবং ২০২৩ সালে ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি বিজ্ঞান মনস্কতা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি জাতি হিসেবে গড়ার দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ হতে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের জন্য ২০২৫, ২০৩১ এবং ২০৪১ এর সময়রেখার মধ্যে নানামুখী কর্মকাণ্ড গ্রহণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আমরা আশা করি ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশকে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ দেশ এবং উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পরিণত করবে। স্মার্ট বাংলাদেশ হবে সাশ্রয়ী, টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিগত এবং উদ্ভাবনী। স্মার্ট বাংলাদেশ প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে ৪টি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে। স্তম্ভগুলো হলো স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ।
ইতোমধ্যে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশে এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে প্রবেশ করছি। স্মার্ট বাংলাদেশ মূলত ফিজিক্যাল, ডিজিটাল এবং বায়োলজিক্যাল এই তিনটি ক্ষেত্রকে এমনভাবে একীভূত করতে চলেছে- যা আগে কখনো পরিলক্ষিত হয়নি।
এমতাবস্তায় স্মার্ট বাংলাদেশ বির্নিমাণ প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে রয়েছে গণমাধ্যম এবং তথ্য প্রবাহের দীর্ঘ দিনের চর্চা। জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর পাশাপাশি গণমাধ্যম জাতিকে পথরেখা প্রণয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে।
নানামুখী ধারণার উপর দাঁড়িয়ে থাকা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দুরূহ প্রকৃতি অনুধাবনের পাশাপাশি, সমাজের নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে গণমাধ্যম, তথ্য এবং বিনোদনে পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত করে কীভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করবো তা জানতে হবে এবং বুঝতে হবে। এটি এক মহাপরিবর্তন এবং আমাদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
চতুর্থশিল্প বিপ্লবের এই যুগে গণমাধ্যম, তথ্য এবং বিনোদন জগতের ভবিষ্যতও পাবে নতুন এক আঙ্গিক। চতুর্থশিল্পবিপ্লবের ফলে কেমন হবে আমাদের গণমাধ্যম, তথ্য এবং বিনোদন জগত এবং এর প্রভাবে আমরা কীভাবে টিকে থাকবো, এই বাস্তবতার আলোকে আমাদের এমন পদ্ধতির কথা চিন্তা করতে হবে যা শিক্ষা, সৃজনশীলতা এবং দক্ষতা বিকাশে গণমাধ্যম, তথ্য এবং বিনোদন জগতের ভূমিকাকে আরও জোরালো এবং যুগপোযোগী করবে। তাহলেই কেবল চতুর্থশিল্প বিপ্লবের যুগে এই ক্ষেত্রগুলো যে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে তা আমরা মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের গণমাধ্যমের প্রযুক্তির ভবিষ্যত বিবর্তন ও কৌশল নিরূপণ করছে যা বাংলাদেশের সম্প্রচার শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে রেডিও, টেলিভিশন এবং প্রিন্ট মিডিয়াতে। সম্প্রচারকারীদের সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের বর্তমান অবস্থা কি এবং শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জসমূহ কি? তাদের আগ্রহের প্রাসঙ্গিক ও সার্বজনীন বিষয়গুলো কি এবং কীভাবে আমরা আমাদের ভালো অনুশীলনগুলোকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তির দৌড়ে সম্পৃক্ত করতে পারি এবং সম্প্রচারের মান উন্নত করতে পারি তা নিয়ে কাজের অবতারণা করা। এছাড়া আলোচ্য বিষয় তৈরিতে সর্বশেষ প্রযুক্তির মিশ্রন ঘটাতে হবে, পুরোনো গণমাধ্যমে আয়ের ব্যবস্থা করা এবং নতুন মিডিয়াকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অথবা পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলা, ভুল বা নকল খবর এবং নতুন গণমাধ্যম, প্রযুক্তির মাধ্যমে গণমাধ্যমের কন্টেন্ট বা অলোচ্য বিষয় বন্টন, আর্কাইভের মাধ্যমে আমাদের সময় এর সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের গুরুত্ব উপলব্ধি করে চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮ সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এর মাধ্যমে ৩.২১ অনুচ্ছেদে লক্ষ্য ও পরিকল্পনার শুরুতেই ঘোষণা করেছেন- ‘২০২১-২৩ সালের মধ্যে ফাইভ-জি চালু করা হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বিগ ডাটা, ব্লক চেইন, আইওটিসহ ভবিষ্যত প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানো হবে’। যা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় । ইতোমধ্যে আমাদের গণমাধ্যম ’র উপর প্রভাবসূমহ পড়তে শুরু করেছে। শ্রোতারা ভিডিও কনটেন্ট দেখতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। আগামী ২/৩ বছরের মধ্যে অডিও কনটেন্ট-এর শতকরা ৯০ ভাগ উন্নীত হবে ভিডিও কনটেন্টে। দেশে ৫জি মোবাইল চালু হচ্ছে। গণমাধ্যমকে চলে যেতে হবে ডিজিটাল সম্প্রচারে।
এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন স্বাধীন, নিরপেক্ষ, গণমুখী ও বিশ^াসযোগ্য গণমাধ্যম গণতন্ত্রের জন্য পূর্বশত। সে মোতাবেক স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণমাধ্যমের ভূমিকা দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়।
প্রথম ভূমিকা হলো-গণমাধ্যমের মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রগতি, দর্শন, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যগুলো জনগণের মাঝে নানামুখী প্রতিবেদন তৈরি ও প্রকাশের মাধ্যমে পৌঁছানো এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বিষয়ে জনগণকে প্রতিবেদন প্রচার ও প্রকাশের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা, স্মার্ট বাংলাদেশ প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জসমূহ বিবেচনায় এনে নানামুখী প্রতিবেদন প্রকাশ করা, সময় সময় অগ্রগতিগুলো তুলে ধরা। স্মার্ট বাংলাদেশ প্রক্রিয়ায় আরো কী কী বাস্তবায়নগত সুযোগ আছে তা তুলে ধরা এবং স্মার্ট বাংলাদেশ প্রক্রিয়া এগিয়ে চলার জন্য জনগণকে সম্পৃক্ত করে তাদের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানো।
দ্বিতীয় ভূমিকা হলো গণমাধ্যমের নিজস্ব দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ: স্মার্ট বাংলাদেশ মূলত ফিজিক্যাল, ডিজিটাল এবং বায়োলজিক্যাল এই তিনটি ক্ষেত্রকে একীভূত করে তার প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম চলবে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি মহাপরিবর্তন। এই পরিবর্তনের সাথে গণমাধ্যমকে খাপ খাওয়াতে হবে। গণমাধ্যমকে স্মার্ট বাংলাদেশ প্রক্রিয়ার সাথে অভিযোজন করার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ হতে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণে গণমাধ্যম ইতোমধ্যে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। প্রযুক্তিগত নানা উদ্ভাবনের ফলে দেশের জনগণের হাতে এখন মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুুক্তি পৌঁছে গেছে। এ সকল ডিজিটাল পরিষেবা জনগণের ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রযুক্তি অর্জনে ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি মানুষের গণমাধ্যম বিষয়ক রুচি ও চাহিদার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। মোবাইল ফোন আসায় বিভিন্ন গণমাধ্যম এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়ে আধেয় ও বিষয়বস্তুর গভীর সম্পৃক্ততা সৃষ্টি করেছে। সংবাদ পরিবেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি নতুন প্রযুক্তিতে, নতুন আঙ্গিকে, নতুন ধ্যান ধারণায় সমৃদ্ধ হচ্ছে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে গণমাধ্যমগুলোতে বিজ্ঞাপনের হারও কমতে শুরু করেছে। আবার সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ভুয়া, বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন খবর গণমাধ্যমগুলোর জন্যে একটি বড়ো ধরনের চ্যালেঞ্জ। রেডিও এবং টেলিভিশনের জন্য প্রচলিত ফরমেট পর্যালোচনা করে নতুন নতুন ফরমেট উদ্ভাবন করা এবং অনুশীলন করার জন্য তাগিদ প্রদান। গণমাধ্যম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে কর্মশালার আয়োজন এবং অন্যান্য অগ্রসর দেশসমূহ হতে অভিজ্ঞতা অর্জন। সময় বদলেছে! প্রথাগতভাবে যে অর্জন হয়েছে তা আমরা তা প্রত্যাখ্যান করতে চাইনা। কিন্তু এটা সত্য যে, আধুনিকীকরণ এমন একটি পদ্ধতি যার ওপর প্রযুক্তির কর্তৃত্ব রয়েছে, বাজারের ওপর প্রভাব রয়েছে, যা চতুর্থশিল্প বিপ্লবের যুগে গণমাধ্যমের ভবিষ্যত নিরূপণের ক্ষেত্রে কাজ করছে।
স্মার্ট বাংলাদেশ প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমকে নিম্নোক্ত ৪ টি বিষয়ে অভিযোজন করা আবশ্যক সেগুলো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনাকে স্মার্ট ব্যবস্থাপনায় পরিণত করা, কর্মরত সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম পেশাজীবিদের জব ঝশরষষরহম এবং টঢ় ঝশরষষরহম এর আওতায় আনা। স্মার্ট বাংলাদেশ বিষয়ক ইউনিট রাখা এবং মাঠ পর্যায়ে তথা জেলা এবং উপজেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের স্মার্ট বাংলাদেশ বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান। বিশেষ করে ডিজিটাল সমাজ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো সম্পর্কে দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ। প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে স্মার্ট বাংলাদেশ বিষয়ক একটি সংবাদ গাইড লাইন প্রণয়ন করা এবং প্রচারিত সংবাদকে মূল্যায়ন করে সময় সময় সাংবাদিকদের পুরস্কৃত করা। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজস্ব প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং নিজস্ব কারিকুলামে মোবাইল জার্নালিজম, ডাটা ড্রিভেন জার্নালিজম, ইনফোগ্রাফিকস তৈরি, সংবাদ প্রণয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, ব্লক চেইন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্তকরণ।
আমরা আশা করি গণমাধ্যমের ভূমিকা স্মার্ট বাংলাদেশ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলি স্মার্ট বাংলাদেশ প্রক্রিয়ায় বিবর্তিত হয়ে একটি জ্ঞান নির্ভর বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
#
পিআইডি ফিচার