রাজশাহীসহ ২৭ জেলায় ছড়িয়েছে রাসেলস ভাইপার, সচেতনতার তাগিদ গবেষকদের

অনলাইন ডেস্ক : রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি অর্থাৎ রাজশাহী অঞ্চলে আছে বহু কাল ধরে। তবে ইদানিং দেশের ২৭ জেলায় সাপটিকে দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে আতঙ্কও ছড়াচ্ছে। প্রাণী গবেষকরা বলছেন, যতটা শোরগোল উঠেছে, পরিস্থিতি ততটা বিপদের নয়।

আবাসস্থল থেকে সাপটির ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি গবেষকদেরও ভাবাচ্ছে। তারা এর কিছু কারণও চিহ্নিত করেছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. ফরিদ আহসান দেশে রাসেলস ভাইপারের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করেছেন। প্রাণিবিদ্যার এই অধ্যাপকের গবেষণাটি ২০১৮ সালের অর্থাৎ এখন থেকে ৬ বছর আগের। তবে তারপর রাসেলস ভাইপার নিয়ে এত বিশদ গবেষণা দেশে আর হয়নি।

২০১৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ২০টি রাসেলস ভাইপার দংশনের ঘটনা বিশ্লেষণ করে সেই গবেষণাপত্র তৈরি করেছিলেন কেমব্রিজের পিএইচডি ডিগ্রিধারী ড. ফরিদ, যা ২০১৮ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়।

ওই গবেষণায় দেখানো হয়, সে সময়ে দেশের উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১৭টি জেলায় রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি আছে।

তবে এখন সাপটি অন্তত ২৭টি জেলায় ছড়িয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে চট্টগ্রামে স্থাপিত ভেনম রিসার্চ সেন্টারের তথ্যে।

রাসেলস ভাইপারের এখনকার বিস্তৃতি নিয়ে কথা বলেছেন ড. ফরিদ আহসান। তিনি তার আগের গবেষণার সঙ্গে সমসাময়িক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে রাসেলস ভাইপারের বিস্তারের কারণগুলো তুলে ধরেছেন।

বছরজুড়ে জমিতে ফসল ফলানো

বাংলাদেশে এখন ফসলি জমি খুবই কম। বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়ায় এসব ফসলি জমি বছরজুড়েই চাষ হচ্ছে। এক ফসলি জমি এখন তিন ফসলিতে পরিণত হয়েছে। এটি রাসেলস ভাইপারের বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

ড. ফরিদ বলেন, আগে কৃষিজমিতে বছরে একবার বা দুইবার ফসল ফলানো হতো এবং বাকি সময় পানির অভাব থাকায় জমি পরিত্যক্ত পড়ে থাকত। বছরজুড়ে ক্ষেতে ফসল থাকায় জমিতে ইঁদুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যা রাসেলস ভাইপার সাপের প্রধান খাদ্য। ইঁদুর বাড়ার সাথে সাথে সাপ পর্যাপ্ত খাদ্য পেতে শুরু করে এবং বংশবিস্তারের জন্য যথাযথ পরিবেশ পেতে থাকে।

ঘন ঝোঁপ আর পরিত্যক্ত জমি অপেক্ষাকৃত কমে যাওয়ায় এই সাপ কৃষিজমিতেই থাকে, যার ফলে যারা মাঠে কৃষিকাজ করেন, তারা রাসেলস ভাইপারের দংশনের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়ে থাকেন।

প্রজনন বেশি হওয়া

অন্য অনেক সাপের মতো রাসেলস ভাইপার সাপটি বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে ডিম পাড়ে না। সরাসরি বাচ্চা দেয়। এর ফলে প্রজননহার বেশি থাকে এবং সরাসরি বাচ্চা প্রসব করায় বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আরও পড়ুনঃ   সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ

ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহকারী গবেষক আব্দুল আউয়াল বলেন, একটি স্ত্রী রাসেলস ভাইপার থেকে একবারে ৩০ থেকে ৩৫টি বাচ্চা হয়। এই বাচ্চাগুলোর ভেতরেও ফিমেইল বেশি।

বাংলাদেশে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত যে আবহাওয়া থাকে, তা রাসেল ভাইপারের বংশবৃদ্ধির উপযোগী বলে জানান তিনি।

খাদক বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া

যেসব প্রাণী রাসেলস ভাইপারকে শিকার করে খেত, সেসব প্রাণীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে অবৈধ পাখি শিকার ও কৃষিজমিতে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশকের ব্যবহার এর জন্য দায়ী, বলছেন গবেষকরা।

ড. ফরিদ বলেন, একইভাবে যেসব প্রাণীকে আমরা রাসেলস ভাইপারের প্রতিযোগী জানতাম, যারা রাসেলস ভাইপারের মতো একইরকম খাবার খায়, তাদের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর ফলে রাসেল ভাইপারের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, বেজি, গুইসাপ, বাগডাঁশ, গন্ধগোকুল, বন বিড়াল, মেছো বিড়াল, তিলা নাগ ঈগল, সারস, মদন টাক এবং কিছু প্রজাতির সাপ রাসেলস ভাইপার খেয়ে বেঁচে থাকতো। কিন্তু সেসব শিকারি প্রাণীর সংখ্যা এখন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে রাসেলস ভাইপারের বংশবৃদ্ধি সহজ হয়েছে।

পানিতে ভেসে পড়ছে ছড়িয়ে

ড. ওয়াহেদ চৌধুরী বলছেন, রাসেলস ভাইপার খুব ভালো সাঁতারু হওয়ায় এর দেহকে হালকা কুণ্ডলী করে (অনেকটা ইংরেজি ঝ এর মতো) নদীর স্রোতকে ব্যবহার করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়, এক চর থেকে অন্য চরে ভেসে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।

ড. ফরিদ বলেন, এখন পর্যন্ত পদ্মা অববাহিকায় এই সাপ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। আমরা দেখেছি যেসব জায়গায় এই সাপ পাওয়া গেছে, তার অধিকাংশ জায়গাতেই কচুরিপানা রয়েছে, আবার কচুরিপানার মধ্যেও এই সাপ পাওয়া গেছে। কাজেই কচুরিপানার ওপরে ভেসে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে এই সাপ বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছেছে।

বর্ষার ঢলে উজান থেকে আসা পানিতে কচুরিপানার ওপর ভেসে কিছু সাপ বাংলাদেশে আসছে বলেও জানান এই গবেষক।

তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দিকে পদ্মা যেখানে বাংলাদেশে ঢুকেছে, ওইদিককার ঝোঁপঝাড়গুলো কিছু জায়গায় কেটে ফেলা হয়েছে। যে কারণে পদ্মার অববাহিকা ধরে নামতে নামতে শরীয়তপুর পর্যন্ত চলে গেছে এই রাসেলস ভাইপার। এরা মূলত বাচ্চা কিংবা বড় অবস্থায় কচুরিপানায় করে আসে। এসে চরে কিংবা ডাঙায় ভিড়ে যায়।

২৭ জেলায় রাসেলস ভাইপার

আরও পড়ুনঃ   বঙ্গবন্ধুর ডাকে রাজারবাগের পুলিশ সেদিন ঘুরে দাঁড়িয়েছিলো

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টার বলেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ৯টি জেলায় চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার সাপ দেখা গিয়েছিল। ২০১৮ সালে এই সাপ থাকা জেলার সংখ্যা বেড়ে হয় ১১টি। এখন ২৭টি জেলায় এই সাপের দেখা মিলেছে।

জেলাগুলো হলো- চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও বরগুনা।

পদ্মা নদী ও তার শাখা নদীর তীরবর্তী জেলাগুলোতে চন্দ্রবোড়ার বিস্তার সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে ভেনম রিসার্চ সেন্টার।

আতঙ্কের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে রাসেলস ভাইপার ধরা পড়ার খবর সোশাল মিডিয়ায় এলেও অনেক ক্ষেত্রেই তার কোনও ভিত্তি পাননি গবেষকরা।

ড. ফরিদ বলেন, আমার গবেষণায় চট্টগ্রাম এলাকায় তখন কোনও রাসেলস ভাইপারের সন্ধান পাইনি। ইদানিংকালে চট্টগ্রামের গুলিয়াখালিতে একটি রাসেলস ভাইপার পাওয়ার খবর জেনেছিলাম কিন্তু পরে সেটি নিশ্চিত করা যায়নি।

সাপ মারার প্রভাব পড়বে খাদ্য শৃঙ্খলে

রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোয় বিভিন্ন স্থানে সাপ মারার খবর আসছে। ফরিদপুরে সাপ মারার জন্য পুরস্কারের ঘোষণাও এসেছিল। কিন্তু দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে এভাবে সাপ মারা বেআইনি।

পরিবেশের জন্য রাসেলস ভাইপারের গুরুত্ব তুলে ধরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাসেলস ভাইপার ইঁদুর খেয়ে যেমন ফসল রক্ষা করে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহকারী গবেষক আব্দুল আউয়াল বলেন, কেবল রাসেলস ভাইপার নয়, যে কোনও বন্যপ্রাণী ধরা, মারা, খাওয়া, পরিবহন কোনওভাবেই কিছু করার সুযোগ নেই।

রাসেলস ভাইপারকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে কাজগুলো হচ্ছে, সেটা আইন পরিপন্থি; যদিও ভয় থেকে মানুষ এটা করছে।

সাপ মারা ‘হিরোইজম’র মতো করে দেখানো হওয়ায় তা এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাপ মারার সূদূরপ্রসারী প্রভাব তুলে ধরে গবেষক আউয়াল বলেন, ফুড চেইনে সাপ অনেক প্রাণীকে নিধন করে। যেমন ইঁদুর। যদি অতিরিক্ত সাপ মেরে ফেলা হয়, সেক্ষেত্রে ইঁদুরের সংখ্যা অনেক বাড়বে।

ইঁদুর যখন বাড়বে, তখন শস্যজাতীয় যত খাবার রয়েছে, তার উৎপাদন কমে যাবে। ইঁদুরবাহিত রোগের প্রকোপের আশঙ্কা তৈরি হবে। এর ফলে যেসব জায়গায় শক্ত মাটি রয়েছে, ইঁদুর যেহেতু শক্ত মাটিতে বাসা করে, সেহেতু সেসব মাটি ধসেরও আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।