কোরবানির বর্জ্য অপসারণদায়িত্ব সবার

এম জসীম উদ্দিন : ঈদ-উল-আজহা মুসলমানদের অন্যতম এক ইবাদত । এ দিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করার নির্দেশ এসেছে পবিত্র কোরআনুল কারিমে। আরবি ‘কোরবান’ শব্দটি ফারসি বা উর্দুতে ‘কোরবানি’ রূপে পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ ‘নৈকট্য’। মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য কুরবানি দেয়। ১০ জ্বিলহজ ফজর থেকে ১২ জ্বিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেকোন প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন পুরুষ ও নারীর কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ৭ ভরি সোনা অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা এর সমপরিমাণ সম্পদ থাকবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
فَصَلِّلِرَبِّكَوَانْحَرْ
অর্থ: ‘অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা কাউসার : আয়াত ২)
তবে এ কোরবানির বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি শর্ত। যার কোনো একটি না থাকলে কোরবানি হবে না। কেননা কোরবানি কোনো লোক দেখানো ইবাদাতের নাম নয়। বরং এটি শুধু আল্লাহর জন্য। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা থেকে প্রমাণিত যে, কোনো নেক আমলই আল্লাহ তায়ালার কাছে ততক্ষণ পর্যন্ত গৃহীত হয় না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তাতে দুটি শর্ত পূরণ হয়। ঠিক এ ক্ষেত্রে কোরবানিও দুই হুকুমের ব্যতিক্রম নয়। শর্ত দুইটি হলো- কোরবানি হবে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং আল্লাহ তায়ালা ও তার রাসূলের নির্দেশিত বিধান অনুযায়ীই কোরবানি করতে হবে।

ঈদ-উল-আজহায় বড় চ্যালেঞ্জ পশুর হাট ও পশু জবাই-পরবর্তী বর্জ্য পরিষ্কার। একটা সময় বর্জ্য নিয়ে নাগরিকরা ভোগান্তিতে পড়লেও গত কয়েক বছর ধরে সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত উপায়ে সারা দেশে পরিষ্কার করা হচ্ছে কোরবানির বর্জ্য। প্রতিবছর এ কাজ নিয়ে বড় ধরনের পরিকল্পনা থাকে দেশের সকল সিটি করপোরেশনের। ইসলাম পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ধর্ম। এখানে অপবিত্রতা ও অপরিচ্ছন্নতার কোনো স্থান নেই। স্বাস্থ্য বিজ্ঞান এবং সকল ধর্মেই পরিচ্ছন্নতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যারা পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করেন আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। সুরা বাকারার ২২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—‘অবশ্যই আল্লাহ তাওবাকারী এবং পরিচ্ছন্নতা অর্জনকারীকে পছন্দ করেন।’ হাদিস শরিফে পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অঙ্গ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বুখারির এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (স.) বলেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অঙ্গ।’ অপর এক হাদিসে রাসুল (স.) ইরশাদ করেন, ‘পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’

কোরবানির বর্জ্য পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে কোরবানি দাতাকে বেশকিছু নিয়ম মানতে হবে যেমন- শহর অঞ্চলে প্রাথমিক পর্যায়ে বর্জ্য পলিথিনে জমা করে রাখতে হবে, রক্ত পানি দিয়ে ধুয়ে কোরবানির স্থলে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিতে হবে। গ্রামাঞ্চলে অবশ্য কোরবানির বর্জ্য মাটিতে পুঁতে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই রাস্তার পাশে বা খালি জায়গায় তা ফেলে না রেখে মাটিতে পুতে রাখা কর্তব্য। মানুষের চলাচলের রাস্তায় কোরবানির পশু জবাই করা উচিত নয়; নির্দিষ্ট নিরাপদ স্থানেই জবাই করা কর্তব্য। কোরবানির পশুর উচ্ছিষ্ট বর্জ্য বাতাসে মিশে বাতাসকে দূষিত করে এবং রোগ-ব্যাধির বিস্তার ঘটায়। এজন্য কোরবানির পর কোরবানিদাতার প্রথম কাজ হচ্ছে বর্জ্য অপসারণ করা। এটা তার ইমানি দায়িত্ব। কোরবানি দেওয়া যেমন সাওয়াবের কাজ, তেমনি কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করাও একটি পুণ্যের কাজ। আবু দাউদ শরিফের এক বর্ণনায় এসেছে, নবি করিম (স.) বলেন- ‘রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো সদকাস্বরূপ। কোরবানির পশু জবাইয়ের পর যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো কোরবানির বর্জ্য পরিষ্কার করা। আমরা অনেকেই নিয়ম না মেনে যত্রতত্র পশু কোরবানি করে থাকি। এটি ঠিক নয়। পশু জবাইয়ের পর বর্জ্য যদি খোলা জায়গায় পড়ে থাকে তবে তা মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর কারণ হতে পারে। পশুর রক্ত, ঘাস, লতাপাতা, নাড়িভুঁড়ির উচ্ছিষ্ট, বর্জ্য রাস্তায় পড়ে থাকলে তা বাতাসের সাথে জড়িয়ে পড়ে। আর এই বর্জ্য আমাদের জন্য মারাত্নক স্বাস্থ্যহানি ঘটাতে পারে। তাই কোরবানি করার পরবর্তী সময়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

আরও পড়ুনঃ   নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ

কোরবানির পরে অবশ্যই করণীয় বিষয়গুলো হলো: বর্জ্য অপসারণ কোরবানির ক্ষেত্রে পশু জবেহ শেষে তার রক্ত ও শরীরের যাবতীয় উচ্ছিষ্ট যথাযথভাবে অপসারণ করা জরুরি। পশু জবাইয়ের গর্তটি মাটি দিয়ে ঢেকে কিছু চুন বা ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক পদার্থ দেয়া যেতে পারে। আর আশেপাশে যদি কোনো বর্জ্য থাকে তাহলে তা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এছাড়া রক্তপানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। পশুর দেহ থেকে নাড়িভুঁড়ির উচ্ছিষ্ট (অর্ধহজমযুক্ত খাদ্য/গোঘাষি) বের করে যত্রতত্র ফেলে দিলে তা পচে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াবে এবং পরিবেশ দূষিত হয়ে বিভিন্ন রোগ ছড়াবে। তাই যথাযথ স্থানে ফেলতে হবে। যে স্থানটিতে পশু জবায় করা হবে ওই স্থানটি সম্ভব হলে গরম পানি অথবা ঠান্ডা পানি ঢেলে পরিষ্কার করার পর অবশ্যই ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিতে হবে। তাহলে দূর্গন্ধ ছড়াবে না এবং জীবনুমুক্ত হবে। বর্জ্য পরিষ্কারের পরে হাত, পা ও সারা শরীর ভালোভাবে পরিষ্কার করতে সেভলন ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেদেরই উদ্যোগী হতে হবে।এককভাবে কোরবানি না করে, মহল্লা ভিত্তিক একটি নির্ধারিত স্থানে কোরবানি করা যেতে পারে। এতে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সম্মিলিতভাবে বর্জ্য অপসারণও সহজ হয়। কোরবানির পর একই ভবনের বেশ কয়েকটি পরিবার মিলে একটি সোসাইটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। যেমন, সবাই মিলে বর্জ্য অপসারণের জন্য লোক ঠিক করা যেতে পারে যারা কোরবানির পর পরই বর্জ্য সরিয়ে নিয়ে যাবে। এতে বর্জ্য অপসারণ দ্রুততর হয় বলে পরিবেশের ওপর তেমন প্রভাব পড়েনা। জবাইকৃত পশুর গোবর ও উচ্ছিষ্ট আলাদা করে খোলাভাবে না ফেলে সেগুলো ব্যাগে ভরে নির্ধারিত স্থান যেমন নিকটস্থ ডাস্টবিন বা কন্টেইনারে ফেলতে হবে। সেখান থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বর্জ্য সহজেই সরিয়ে নিতে পারে। তাছাড়া পশু জবাই ও মাংস বানানোর কাজ শেষ হলে বর্জ্য পরিষ্কারের জন্য নিজ নিজ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বরত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করলে তারাও সহযোগিতা করবে।

আরও পড়ুনঃ   পঞ্চদশে পানিসম্পদ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তি পর্যায়ে বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে সচেতনতার পাশাপাশি কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। গত বছর ঢাকা দক্ষিণে পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত ছিলো ৮ হাজার ২০০ জন কর্মী। এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে ৩৫০টি গাড়ি। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন ৯ হাজার ৯০০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছে ৫৩৮টি। অনেক নাগরিকই কোরবানির পরে বর্জ্যটা যেকোন স্থানে রেখে চলে যায়। এতে একদিকে যেমন নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হয়, তেমনি নগর কর্তৃপক্ষ এটা পরিষ্কার করতে সময় নেয়। ফলে সেখান থেকে দুর্গন্ধ এবং রোগজীবাণু ছড়ায়। তাই এককভাবে, যৌথভাবে বা সমন্বিতভাবে নাগরিকরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অংশ নিলে পুরো নগরীর বর্জ্য সহজেই পরিষ্কার করা সম্ভব।

সামর্থবানদের জন্য কেরবানি করা আল্লাহর বিধান, কিন্তু এই বিধান পালন করতে গিয়ে যেন পরিবেশ দুষিত না হয় সে দিকে কোরবানি দাতাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। ।
#
লেখক: তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর, ঢাকা
পিআইডি ফিচার