বিলুপ্ত হওয়া বিষধর রাসেল ভাইপার ফিরে এসেছে ভংঙ্কররুপে!

মোঃ হায়দার আলী : সিংহভাগ মানুষের আক্বীদা-বিশ্বাসের উপর আঘাত হানার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নাস্তিক্যবাদী যে চক্রান্ত অব্যাহত রয়েছে, তার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত হ’ল এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। বৃটিশদের চাকরিজীবী, পেশাজীবী ও কেরানী তৈরি করার লক্ষ্যে নিবেদিত ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের দর্শনে পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থা এদেশের আম জনমানুষের শাখায়-প্রশাখায় এমনভাবে পাশ্চাত্যের ভোগবাদী জীবনাদর্শকে ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় যেন নেই। স্বাধীনতার পর যতগুলো শিক্ষাক্রম এসেছে, প্রতিটি শিক্ষাক্রমেই একটু একটু করে গেড়ে দেয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বীজ, আর পাল্লা দিয়ে কমানো হয়েছে মুসলিম হিসাবে আত্মপরিচয় গঠনের সুযোগগুলো। এ বিষয়ে লিখার জন্য চিন্তা ভাবনা করলাম, কিন্তু এমন সময়ে আমার এক ছাত্র মোবাইল করে বললেন রাসেল ভাইপার সাপ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে, আমরা একটি রাসেল ভাইপার সাপ মেরেছি। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন এ ব্যপারে কিছু লিখেন স্যার। যদি মানুষের উপকারে আসে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টেলিভিশন, পত্র পত্রিকায়, অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখলাম রাসেলস ভাইপারের কামড়ের বিষাক্ত ছোবলে কৃষক, শিক্ষার্থীসহ কিছু মানুষ মারা গেছেন এবং এধরনের অনেক সাপকে মানুষ মেরে ফেলেছে যা ফেসবুকে ছবি পোস্ট করছেন। আতঙ্কিত মানুষের কথা চিন্তা করে লিখার থিম পরিবর্তন করে । আল্লাহর নাম নিয়ে এ সাপ সম্পর্কে লিখার চেষ্টা করচ্ছি।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায়, বিশেষ করে পদ্মা তীরবর্তী কয়েকটি জেলা ও চরাঞ্চলে, গত কিছুদিন যাবত বিষাক্ত রাসেলস ভাইপার সাপের কামড়ে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত দুইজন মারা গেছেন। রাসেলস ভাইপার সাপ বাংলাদেশে চন্দ্রবোড়া বা উলুবোড়া নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে যেসব সাপ দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বিষাক্ত। এই সাপের কামড়ে শরীরের দংশিত অংশে বিষ ছড়িয়ে অঙ্গহানি, ক্রমাগত রক্তপাত, রক্ত জমাট বাঁধা, স্নায়ু বৈকল্য, চোখ ভারী হয়ে যাওয়া, পক্ষাঘাত, কিডনির ক্ষতিসহ বিভিন্ন রকম শারীরিক উপসর্গ দেখা যেতে পারে।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাপের এই প্রজাতিটি বাংলাদেশ থেকে বহু বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু গত ১০-১২ বছর আগে থেকে আবারো এই সাপের কামড়ের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রজাতির সাপ এই অঞ্চলে আবার কীভাবে ফিরে আসছে, তা নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণা চলছে।

কীভাবে ফিরে আসছে রাসেলস ভাইপার : বাংলাদেশে রাসেলস ভাইপারের পুনরাবির্ভাব ও এই সাপ থেকে মানুষের ঝুঁকির বিষয়ে গবেষণা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আহসান মনসুর। ২০১৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ২০টি রাসেলস ভাইপার দংশনের ঘটনা বিশ্লেষণ করে, করা গবেষণাটি ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইাটি, বাংলাদেশে। সেসময় ঐ গবেষণায় উঠে আসে যে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৭টি জেলাতেই রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি রয়েছে। ঐ গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতেই এই সাপের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। ঐ গবেষণায় উঠে আসে যে এই প্রজাতির সাপের সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি ছিল রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তবে বর্তমানে আরো বেশি এলাকায় এই প্রজাতির সাপের উপস্থিতি রয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মি. আহসান ধারণা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বল্প সংখ্যক রাসেলস ভাইপার সবসময়ই ছিল, কিন্তু বংশবিস্তারের মত পরিবেশ ও পর্যাপ্ত খাদ্য না থাকায় এই সাপের উপস্থিতি তেমন একটা বোঝা যায়নি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এই সাপের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলানো – বিবিসি বাংলার সাথে কথা বলার সময় মন্তব্য করেন ফরিদ আহসান। “আগে কৃষিজমিতে বছরে একবার বা দুইবার ফসল ফলানো হত এবং বাকি সময় পানির অভাব থাকায় জমি পরিত্যক্ত পড়ে থাকতো। ৯০’ এর দশকে সেচ পদ্ধতির উন্নতির সাথে সাথে কৃষকরা বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল ফলানো শুরু করেন এবং জমি কম সময় পরিত্যক্ত থাকতে শুরু করে।” “সারা বছর ক্ষেতে ফসল থাকায় জমিতে ইঁদুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যা এই সাপের প্রধান খাদ্য। আর ইঁদুর বাড়ার সাথে সাথে সাপ পর্যাপ্ত খাদ্য পেতে শুরু করে এবং বংশবিস্তারের জন্য যথাযথ পরিবেশ পেতে থাকে,” বলেন মি. আহসান। ঘন ঝোপ আর পরিত্যক্ত জমি অপেক্ষাকৃত কমে যাওয়ায় এই সাপ কৃষি জমিতেই থাকে, যার ফলে যারা মাঠে কৃষিকাজ করেন তারা রাসেলস ভাইপারের দংশনের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়ে থাকেন। এছাড়া বর্ষাকালে নদীর পানি বাড়ার ফলে ভারতের নদ-নদী থেকে ভেসেও এই সাপ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে বলে জানান মি. আহসান। “এখন পর্যন্ত পদ্মা অববাহিকায় এই সাপ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। আমরা দেখেছি যেসব জায়গায় এই সাপ পাওয়া গেছে তার অধিকাংশ জায়গাতেই কচুরিপানা রয়েছে, আবার কচুরিপানার মধ্যেও এই সাপ পাওয়া গেছে। কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি কচুরিপানার ওপরে ভেসে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় এই সাপ বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছেছে।”
মূলত বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রমাণ পাওয়া গেলেও সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পটুয়াখালীতেও এই সাপের দেখা মিলেছে বলে জানান অধ্যাপক ফরিদ আহসান। এছাড়া ২০১৪ ও ২০১৫ সালে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি চর এলাকায় বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার করা অন্তত পাঁচটি রাসেলস ভাইপার সাপ অবমুক্ত করা হয়। তবে অধ্যাপক আহসান মনে করেন অবমুক্ত করা অল্প কয়েকটি সাপ বাংলাদেশে এই প্রজাতির সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে খুব বেশি ভূমিকা রাখেনি। কতটা

আরও পড়ুনঃ   কাল পহেলা বৈশাখ, বাংলা ১৪৩১ সালের প্রথম দিন

মারাত্মক এই সাপের দংশন: বাংলাদেশে রাসেলস ভাইপারের দংশনের হার খুব বেশি না হলেও ভারতে প্রতি বছর যে পরিমাণ সর্প দংশনের ঘটনা ঘটে তার মধ্যে অন্তত ৪৩% এবং শ্রীলঙ্কায় প্রতি বছর মোট সর্প দংশনের ঘটনার ৩০-৪০% রাসেলস ভাইপারের কারণে হয়ে থাকে। সাধারণত কৃষি জমিতে থাকে বলে মানুষ অনেক সময়ই সাপের গায়ে পা দেয় বা না জেনে একে বিরক্ত করে থাকে। আর রাসেলস ভাইপার বিপন্ন বোধ করলে আচমকা আক্রমণ করে থাকে। এই প্রজাতির সাপের কামড়ের কিছুক্ষণ পরই দংশিত স্থানে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ব্যাখ্যার পাশাপাশি দংশিত স্থান দ্রুত ফুলে যায় এবং ঘণ্টা খানেকের মধ্যে দংশিত স্থানের কাছে শরীরের আরো কয়েকটি অংশ আলাদাভাবে ফুলে যায়।

দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে নিম্ন রক্তচাপ, কিডনি অকার্যকর হওয়া সহ বিভিন্ন ধরণের শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের দংশনে দংশিত হয়, যার মধ্যে প্রতি বছর অন্তত এক লাখ মানুষ মারা যায়। আর সাপের দংশনে আহত হয়ে বছরে প্রায় ৪ লাখ মানুষের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় অথবা পঙ্গুত্ব বরণ করেন। সংস্থাটির ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর অন্তত ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং বছরে অন্তত ছয় হাজার মানুষ মারা যান।

পদ্মার চরাঞ্চলে ভয়ংকর রাসেল ভাইপারের উপদ্রব, রাসেল ভাইপার সম্পর্কে বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জোহরা মিলা বলেন, “আইইউসিএনের ২০১৫ সালের লাল তালিকা অনুযায়ী রাসেলস ভাইপার বাংলাদেশে সংকটাপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে। এটি ইঁদুর ও টিকিটিকি খায়। বসতবাড়ির আশেপাশে এদের প্রাচুর্যতা বেশি থাকায় খাবারের খোঁজে রাসেলস ভাইপার অনেক সময় লোকালয়ে চলে আসে এবং মানুষকে দেখে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে কখনও কখনও আক্রমণও করে।”

এ সাপ চেনার উপায়, বিষদাঁত, আক্রান্ত রোগির অবস্থাঃ বাংলাদেশের অত্যন্ত বিষধর সাপের মধ্যে একটি দেশে যতগুলি বিষধর সাপ আছে তার মধ্যে একটি রাসেলস ভাইপার। এটি ‘চন্দ্রবোড়া’ নামেও পরিচিত।

রাসেল ভাইপারের কামড়ে ৯০ শতাংশ রোগী মারা যাচ্ছেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। বিষধর এই সাপটি চিনতে না পারায় চিকিৎসা নিতে দেরি করায় মৃত্যর ঘটনা বাড়ছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো বিশ্বে প্রতি বছর সাপের কামড়ে যত মানুষ মারা যায়, তার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কেবল এ সাপের কামড়েই মারা যায়। বিশ্বজুড়ে রাসেলস ভাইপারের দুর্নাম রয়েছে।

ভারতের মোদিনীপুর বিষয়ক ওয়েবসাইট মিডনাপুর ডট ইন-এর বন্যপ্রাণী বিষয়ক উপদেষ্টা রাকেশ সিংহ দেব বিস্তারিত একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন এ সাপের ওপর। সাপটির শনাক্তের বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, রাসেলস ভাইবার সাপের দেহ মোটাসোটা, লেজ ছোট ও সরু হয়ে থাকে। মাথা চ্যাপ্টা ত্রিকোণাকার। মাথার তুলনায় ঘাড় অনেকটাই সরু। শরীরের রঙ বাদামি, হলদে বাদামি অর্থাৎ কাঠ রঙের হওয়ায় শুকনো পাতার মধ্যে এই সাপ নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে। সাপটির জিহ্বার রঙ বাদামি বা কালো। সারা গায়ে স্পষ্ট বড়ো গাঢ় বাদামি গোলগোল দাগ থাকে, এই দাগগুলোর মাথা ছুঁচালো। অনেকসময় দাগগুলো একসঙ্গে দেখতে শিকলের মতো লাগে। গোলাকার দাগগুলো দেখতে অনেকটাই চাঁদের মতো। দাগগুলোর চারপাশে কালো রঙের বর্ডার থাকে, তার মধ্যে সাদা বা হলুদের ছিটে লক্ষ্য করা যায়। পেটের দিকের আঁশ এর রঙ সাদা। এদের বিষদাঁত লম্বা। বিষদাঁতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫-১৬ মিমি পর্যন্ত হয়ে থাকে। রাসেলস ভাইপারের বিষদাঁত পৃথিবীতে দ্বিতীয় সবচেয়ে বৃহৎ দাঁত।

গায়ের রঙ এবং প্যাটার্নের মিল থাকায় অনেকেই বিষহীন বালুবোড়া সাপের সঙ্গে বিষাক্ত রাসেলস ভাইবারকে গুলিয়ে ফেলেন। এছাড়া অনেকে ছোট অজগর ভেবে ভুল করেন। কিন্তু ভালো করে পর্যালোচনা করলে সহজেই সাপ দুটোর মধ্যে পার্থক্য করা যায়।

সাধারণত সব সাপ মানুষকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে, কিন্তু রাসেলস ভাইপার সাপের স্বভাব ঠিক উল্টো। এরা সচরাচর পালিয়ে যায় না। নিজেদের বিপন্ন মনে করলে আক্রমণ করে বসে। বিষধর সাপ হিসেবে পৃথিবীতে রাসেলস ভাইপারের অবস্থান পঞ্চম। কিন্তু হিংস্রতা আর আক্রমণের দিক থেকে এর অবস্থান প্রথম। আক্রমণের ক্ষেত্রে এই সাপ এত ক্ষিপ্র যে, ১ সেকেন্ডের ১৬ ভাগের ১ ভাগ সময়ের ভেতরে কামড়ের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। এরা প্রচণ্ড জোরে হিস হিস শব্দ করতে পারে।

২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, রাসেলস ভাইবার সাপের কামড়ের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে কিংবা কয়েক ঘণ্টা পরে শুরু হতে পারে। প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার বিষয়টি কামড়ের গভীরতা, বিষের মাত্রা, সাপের দৈর্ঘ্য ও বয়সের ওপর নির্ভর করে।

মিডনাপুর ডট ইন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাসেল ভাইবার সাপের কামড়ে তীব্র জ্বালাযন্ত্রণা শুরু হয়। কামড়ের জায়গা দ্রুত ফুলতে থাকে, দংশনের স্থান থেকে চুঁইয়ে রক্ত বের হতে পারে। চোখের কোণ, দাঁতের মাড়ি, নাক বা যে কোনো কাটা অংশ থেকে, থুতুর সঙ্গে, বমি, প্রস্রাব বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত আসতে পারে। চোখ লাল হয়ে যায়, কোমরের দিকে ও পাঁজরের নিচের দিকে ব্যথা শুরু হয়। সারা শরীর বিশেষ করে পা ফুলতে থাকে।

রাসেলস ভাইপার সাপের বিষ তীব্র রক্তধ্বংসকারী বা হোমটক্সিন প্রকৃতির। এই বিষে শরীরের রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করে। ফলে ফুসফুস বা কিডনি বিকলের কারণে রোগী মারা যেতে পারে। উপযুক্ত চিকিৎসা না করালে কামড়ের একদিন থেকে ১৪ দিনের মধ্যেও রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   মেট্রোরেল বদলে দিচ্ছে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা

সাপে কামড়ালে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকতে হবে। যে জায়গা কামড়েছে, সেই জায়গা খুব বেশি নড়াচড়া করানো যাবে না। সাপে কামড়ানোর পর প্রথম ১০০ মিনিট খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়ের মধ্যে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। যেহেতু রাসেলস ভাইপার সাপের কামড়ে রোগীর কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই রোগীকে এমন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত যেখানে ডায়ালাইসিসের সুব্যবস্থা রয়েছে।

গত ৬ মে রাসেল ভাইপারের দংশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। নিহত শিক্ষার্থীর নাম শাকিনুর রহমান সাব্বির। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায়। এ বিষয়ে সাব্বিরের বন্ধু রাকিবুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, মাগরিবের নামাজ শেষে কয়েক বন্ধু মোক্তার বাজার সংলগ্ন পদ্মার পাড়ে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। সেখানে সবাই জিলাপি খাচ্ছিলাম। জিলাপি খাওয়া শেষে আমাদের মধ্যে একজন কাগজের প্যাকেটটা ছুড়ে ফেলে দেয়। সাব্বির হাত মোছার জন্য ঐ প্যাকেটের কাগজটা তোলার সময় বিষধর রাসেল ভাইপার তাকে কামড় দেয়। তখন সাপটিকে মেরে আমরা বন্ধুরা তাকে আধাঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু শেষমেশ তাকে আর বাঁচানো গেল না। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহম্মেদ জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষার্থী মারা গেছেন তার মৃত্যুর কারণ রাসেল ভাইপার সাপের দংশন। এই সাপে কাউকে দংশন করলে তার বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম। তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। তবে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার গোদাগাড়ী ইউনিয়নের চম্পকনগর গ্রামের বাসিন্দা সামাউন গত (৫ মে বুধবার) পদ্মা নদীর ওপারে পাঁকা ধান কাটতে গিয়ে রাসেল ভাইপারের কামড়ে সাথে সাথে তার মূত্যু হয়।
গত ১৮ মে মঙ্গলবার পোতাহার (পালসা) সকাল ৬টা সময় ধান ক্ষেতে কৃষকরা রাসেল ভাইপার সাপ দেখতে পেলে সাপটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। ১৬ মে রোববার) গোদাগাড়ী পৌরসভার সুলতানগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় এর পাশে সারাংপুর কাচারীপাড়া কৃষকরা বোরো পাঁকা ধান কাটছিল এসময় ফারুক আহমেদ নামে এক কৃষক সাপটি দেখতে পেলে সবাই মিলে সাপটি পিটিয়ে মেরে ফেলে। ১৮ ও ১৯ মে র দুপুরে পৌরসভার কুঠিপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে থেকে দুইদিনে রাসেল ভাইপার সাপ দেখতে পেলে স্থানীয় জনতা সাপ মেরে ফেলে।

গত ৭ মার্চ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বিষধর সাপ রাসেল ভাইপারের কামড়ে ইটভাটা ব্যবসায়ী তারিক শেখের মৃত্যু হয়েছে। পদ্মা নদীতে মঙ্গলবার মাছ ধরতে গেলে সাপ তাকে কামড়ায়। তারিক শিলাইদহ ইউনিয়নের কল্যাণপুরের আব্দুর রশিদ শেখের ছেলে।
কবিরাজি চিকিৎসায় তার অবস্থার অবনতি হলে রাত ১২টার দিকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক তারিকের শরীরে এন্টি ভেনোম ইনজেকশন পুশ করার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু পরদিন সকালে তারিক মারা যান।

গত ৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন উপজেলায় বিষধর ‘রাসেলস ভাইপার’ সাপের কামড়ে অসুস্থ হয়ে মো. বিশা প্রামাণিক (৫৪) নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। সাপের কামড়ের এক মাস ছয় দিন পর তিনি মারা যান। ফরিদপুর, ঢাকার হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নিয়েছেন কৃষক বিশা প্রামাণিক। তিনি চরভদ্রাসন উপজেলা সদর ইউনিয়নের টিলারচর গ্রামের ডেঙ্গুর প্রামাণিকের ছেলে।

গত ১ মার্চ ফরিদপুর সদর উপজেলায় দুপুরে দিকে ভুট্টা ক্ষেতে পানি দেওয়ার সময় লাল মিয়াকে বিষধর ‘রাসেলস ভাইপার’ সাপে কামড় দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি ৫ দিন ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরিবারকে জানান, লাল মিয়ার কিডনি এবং ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছে। হাসপাতালে রাখলে উন্নতি হবে না। “পরে শেষ চেষ্টা হিসেবে কবিরাজি চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর সদর উপজেলা খুশির দোকান গজারিয়া কবিরাজের বাড়িতে নিয়ে যায় তার পরিবার। রাত ২টার দিকে লাল মিয়ার মৃত্যু হয়।” রাসেল ভাইপারের হাত থেকে বাঁচনে সচেতনেতার কোন বিকল্প নেই।

বরেন্দ্র অঞ্চলে এই সাপের আক্রমণ বেশী হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে সে এলাকার মাটি এবং রাসেল ভাইপারের গায়ের রঙ প্রায় এক তাই অনেক সময় না দেখেই মানুষ কাছে চলে যায়। এই সাপকে দেখলে নিরাপদে সরে যাওয়াই উত্তম তবে কিছু বিষয়ে সচেতন থাকলে এর থেকে বাঁচা সম্ভব। আশেপাশের পুরাতন পরে থাকা গাছের নিচে খেয়াল না করে হাত না দেওয়া। ধান কাটার সময় গামবুট ব্যাবহার করা।
ধান কাটা শুরুর আগে হাড়ি-পাতিল বা অন্য কিছু দিয়ে প্রচণ্ড শব্দ করা যেন সে ভয়ে পালিয়ে যায়। যেহেতু এরা খুবই হিংস্র তাই যে সব এলাকায় বেশী দেখা যায় সে সব এলাকায় সচেতনভাবে চলাফেরা করা এবং উপস্থিতি লক্ষ্য করলে সামনে থেকে সরে যাওয়া। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, আগে এখনকার মতো মুহূর্তেই খবর জানা যেত না তাই হয়তো জানা যেত না কখন কোথায় কোন সাপের দেখা মিলে। কিন্তু এখন ইন্টারনেটের কারণে মুহূর্তেই সবাই জানতে পারছি এবং পরিচয় ও সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ২৫ বছর বিলুপ্ত ছিল এই মতের সাথে আমি একমত না। তবে রাসেল ভাইপার খুবই হিংস্র এদের থেকে বাঁচতে হলে সচেতন হতে হবে।

লেখক : মোঃ হায়দার আলী,প্রধান শিক্ষক,
মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়
গোদাগাড়ী, রাজশাহী।