আত্মদর্শনের নিমগ্নতায় বিমূর্ত পঙতিমালা, আব্দুর রাজ্জাক

কবি শামীমা নাইসের কবিতা:
“নিঃসঙ্গ অরণ্যে নীল ঘাসফুল” এর কবি শামীমা নাইস। তিনি এ প্রজন্মের কবি। নিয়মিত কবিতা লিখছেন। কবিতার মাঝেই তাঁর বসবাস। তাঁর কবিতা লেখার নেশা অসাধারণ। তিনি সারা বাংলা – ১৯৮৮ ‘র একজন বন্ধু। কবিতার নিমগ্নতায় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “নিমগ্ন প্রার্থণায় তুমি,” ২০২২ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “শূন্যতার প্রতিবিম্বে অতল জোছনা, ” ২০২৩ সালে প্রকাশিত।
একুশ বইমেলা ২০২৪ এ প্রকাশিত তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ : “নিঃসঙ্গ অরণ্যে নীল ঘাসফুল।” প্রান্ত প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও সংগঠক প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামাণিক বইটির মুখবন্ধ / গৌরচন্দ্রিকা লিখেছেন। কবি শামীমা নাইস এর তৃতীয় এ বইটি নিয়েই দু’ একটি কথা বলতে চাই। শামীমা নাইস এর কবিতায় প্রকৃতিপ্রেম, বিরহ, আনন্দ, কাব্যরস, জীবনঘনিষ্ঠ অনুভূতিগুলো আকৃষ্ট করে আমাদের। তিনি কর্মজীবী নারী হিসেবে শত ব্যাস্ততার ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লিখছেন, আবৃত্তি চর্চাও সচল রেখেছেন।

তাঁর কবিতার পরশ ছোঁয়ায় একবার স্পর্শিত হলে গোটা বইটি একপলকে না পড়ে আর থাকা যায় না। আমি তাঁর কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর তিনটি বই-ই আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। নতুন “নিঃসঙ্গ অরণ্যে নীল ঘাসফুল ” আগ্রহভরেই আত্মস্থ করেছি। কাব্যের নামকরণও হয়েছে কবিতা থেকে। সেই নিঃসঙ্গ অরণ্যে কবি তাঁর প্রিয়জনকে ছাড়া একা বোধ করেন।
তাঁর ভাষায়: “তুমিহীন একলা আমি যেন নক্ষত্রহীন নিঃসঙ্গ গ্রহ! ঐশ্বরিক বেদনাহত তুমিহীন আমি যেন নিঃসঙ্গ অরণ্যে নীল ঘাসফুল! ” কী আবেগ, কী ভালোবাসা প্রিয় মানুষটির জন্য তা ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে আমাদের। প্রিয় মানুষকে নিয়েই যেন তাঁর চিন্তা -চেতনা, স্বপ্ন-আশা, কল্পনা।

প্রিয় দেশকে নিয়েও কবির অনেক ভাবনা, অনেক ভালোবাসা যার প্রমাণ পাই বইটির প্রথম কবিতা ‘অমর একুশে’ থেকে। যে বাংলা ভাষায় আমরা কবিতা পড়ি, কথা বলি, বাংলা ভাষা আন্দোলনে শহিদেরা তাঁদের রক্ত দিয়ে লিখে দিয়ে গেছেন। কবির ভাষায়: “রক্ত ভেজা মাটিতে, বাতাসের গায়ে আপামর বাঙালির বেদনা সিক্ত হৃদয়ে বীর শহিদেরা রক্ত দিয়ে লিখে গেলেন প্রাণপ্রিয় বর্ণমালা অ আ ক খ।”
রাজশাহী মহানগরীর একটা ঐতিহ্য আছে, একটা ঐতিহাসিকতা আছে। রাজশাহীর আকাশে বাতাসে যাঁর নাম ধ্বনিত, সেই জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান’কে স্মরণ করেছেন তাঁর ‘বিবেকের ক্রন্দন শুনতে কি পাও’ কবিতায়। সেখানে আমরা পাই: “হাস্নাহেনার মতো সৌরভ ছড়াবে বলেই হয়তো তোমার নাম রাখা হয়েছিল হেনা, বেড়ে উঠেছ পদ্মা বিধৌত পূণ্যভূমি রাজশাহীতে। সর্বজনীনতা, ভ্রাতৃত্বের অসীম গুণ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সহচর ছিলে আমৃত্যু; মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার আজীবন।”

আরও পড়ুনঃ   রাজশাহী পদ্মায় ডুবে নিখোঁজ ৩ জন

তাঁর কাব্যে প্রকৃতি প্রেম, রোমান্টিকতা সদা উথলিয়ে পড়ে যা আমরা ‘ইষ্টিকুটুম’ কবিতায় লক্ষ্য করি: “ আনন্দ জাগানিয়া গুনগুন গান ধরা মধুর দুপুরে বসন্ত এসে ঠকঠক কড়া নাড়লো দুয়ারে ; শব্দের জলসিঁড়ি বেয়ে – কবিতা এসে ধরা দিল কবির কলমে। ” তাঁর রোমান্টিকতার আর এক কবিতা ‘স্বপ্নপিয়াসী মন’ যেখানে কবি দেখিয়েছেন কীভাবে মনসুখ খুঁজতে হয়: “ স্বপ্নপিয়াসী মন একদিন জেগে উঠেছিল হেমন্তের ভোরে- লাল ঝুঁটি মোরগের ডাকে ; উত্তাল কুয়াশায় ঝাঁপ দিয়ে নিসর্গ নিঃস্তব্ধতায় হিমশীতল আদুরে বাতাসে শেফালির ঘ্রাণ মেখে খুঁজেছিল ভৈরবী সুখ।”

শামীমা নাইসের কবিতায় প্রেম- রোমান্টিকতা, ভীষণ ভালোলাগা খুঁজে পাই ‘চিঠির ভাঁজে’ কবিতায় আমরা যেভাবে : ” চিঠির ভাঁজে স্বপ্ন ছিল কাব্যরসে সিক্ত হৃদয় তখন গভীর প্রেমে ভীষণ অনুরক্ত। ” তাঁর আর এক অনন্ত সুখরস পাওয়া যায় ‘সুখের প্রণয়’ কবিতায়: “ আমি অধরা চাঁদ তবু ধরা দিই তোমার বুকে তোমার ঢেউয়ের লুকোচুরি খেলায় মেতে উঠি উল্লাসে। ” কবি আবার কখনো নিজকে নিঃসঙ্গ, একাকী ভেবে বিরহের যন্ত্রণায় উৎকণ্ঠা হয়েছেন; যা তাঁর ‘বিপন্ন বর্ষা’ কবিতায় আমরা লক্ষ্য করি: “ মনে হয় এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে আমি একা খুব একা; কোথাও কেউ নেই, নেই কোথাও কেউ।”

নারীবাদী কবিরা তো নারীর পক্ষে জয়গান গাইবেন, এমনটিই স্বাভাবিক। নারীকে তিনি কীভাবে মানুষ হিসেবে দেখতে চান তা -তাঁর ‘বালিকা তুমিও মানুষ’ কবিতায় আমরা দেখতে পাই : “ বালিকা তুমি
আলোর আঁধার সঞ্জীবনী সুধায় ভরা পাত্র। তুমি বৃত্তের মধ্যে থেকো না বন্দী, জীবনের স্বরলিপি ছুঁয়ে সমাজ, সংসারের সেরা কাজটি তুমিই পারো; পৃথিবী জানুক তুমি শুধু নারী নও, তুমি পরিপূর্ণ মানুষ। ”

আরও পড়ুনঃ   পঞ্চদশে পানিসম্পদ

গ্রন্থটির শেষ কবিতা ‘ কুয়াশার মিছিলে একদিন ‘ ; যেখানে কবি কুয়াশার জলে স্বচ্ছ-পবিত্র মানুষ হয়ে আলো ছড়াতে চান একদিন। আমরাও তো সেটাই প্রত্যাশা করি! “একদিন কুয়াশার স্নিগ্ধ জলে অবগাহন করে হতে চেয়েছিলাম প্রকৃতির মতো পবিত্র, গোটা সূর্যকে ধারণ করতে চেয়েছিলাম বুকের ভিতর ; হতে চেয়েছিলাম মুক্তোদানার মতো দ্যুতিময়।”

চমৎকার একটি ভাবনার মধ্যে দিয়েই কাব্যটির ইতি টানা হয়েছে। মনে হচ্ছে এরকম ভাবনা তিনি ভাবতেই থাকুন, এমন কবিতা তাঁর চলতেই থাকুক। এ যে শেষ হয়েও হলো না শেষ! অনিঃশেষ শুভকামনা রইলো কবির জন্য। আরো উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি তাঁর “নিঃসঙ্গ অরণ্যে নীল ঘাসফুল” কাব্যগ্রন্থটির জন্য। জয় হোক যুগে যুগে কবিমানসের, সুপাঠ্য কবিতার, প্রিয় কবির। গ্রন্থটির শেষ কবিতা’ কুয়াশার মিছিলে একদিন ‘ ; যেখানে কবি কুয়াশার জলে স্বচ্ছ-পবিত্র মানুষ হয়ে আলো ছড়াতে চান একদিন। আমরাও তো সেটাই প্রত্যাশা করি! “একদিন কুয়াশার স্নিগ্ধ জলে অবগাহন করে হতে চেয়েছিলাম প্রকৃতির মতো পবিত্র, গোটা সূর্যকে ধারণ করতে চেয়েছিলাম বুকের ভিতর ; হতে চেয়েছিলাম মুক্তোদানার মতো দ্যুতিময়।”

চমৎকার একটি ভাবনার মধ্যে দিয়েই কাব্যটির ইতি টানা হয়েছে। মনে হচ্ছে এরকম ভাবনা তিনি ভাবতেই থাকুন, এমন কবিতা তাঁর চলতেই থাকুক। এ যে শেষ হয়েও হলো না শেষ! অনিঃশেষ শুভকামনা রইলো কবির জন্য। আরো উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি তাঁর “নিঃসঙ্গ অরণ্যে নীল ঘাসফুল” কাব্যগ্রন্থটির জন্য। জয় হোক যুগে যুগে কবিমানসের, সুপাঠ্য কবিতার, প্রিয় কবির।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, কবি ও প্রাবন্ধিক।