বাংলাদেশের হটলাইন নম্বর ও তার ব্যবহার

মোঃ তৌহিদুজ্জামান : ‘হটলাইন কী?’- এটা ভর্তি বা নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন এমন মানুষের কাছে মোটেই অপরিচিত কোনো প্রশ্ন নয়। তাই উত্তরটিও সকলেরই জানা। ক্রেমলিন (রাশিয়া) ও হোয়াইট হাউজের (যুক্তরাষ্ট্র) মধ্যে সরাসরি টেলিফোন লাইন। অভিধানগুলোতে হটলাইনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, বিশেষ উদ্দেশ্যে, জরুরি পরিস্থিতিতে বা সরকার প্রধানদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য স্থাপিত টেলিফোন লাইনকে হটলাইন বলে।

দেশের সকল জনগণকে বা নির্ধারিত জনগোষ্ঠীকে জরুরি অবস্থায় বা নির্দিষ্ট পরিষেবা প্রদানের জন্য পৃথিবীর অনেক দেশে টোল ফ্রি টেলিফোন পরিষেবা চালু রয়েছে। পূর্বে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঐসব দেশের হটলাইনে ফোন করার মাধ্যমে নানা ধরনের উদ্ধার বা সেবা প্রদানের সংবাদ জেনে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। সে মুগ্ধতা এখন কিন্তু অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। কারণ এখন আমাদের দেশেই অনেকগুলো হটলাইন পরিচালিত হচ্ছে এবং সেগুলোতে কল করে ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গভীর সমুদ্রে ভাসতে থাকা জেলে বা বনে-পাহাড়ে পথহারা পর্যটকদের উদ্ধারের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আমরা যেমন জেনেছি তেমনি গণপিটুনি থেকে বাঁচতে চোরের হটলাইনে কল করার চাঞ্চল্যকর সংবাদও পেয়েছি একাধিকবার।

আমাদের হটলাইনগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য কল হচ্ছে এবং চালুর ৫-৬ বছরের মধ্যে কোনো কোনো নম্বরে কয়েক কোটি কল হয়েছে। হটলাইনে বেশি বেশি কলের অর্থ অনেক মানুষ এ নম্বরগুলো জেনে গেছে। তবে একথাও সত্য যে, দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষ হটলাইন নম্বর বিষয়ে ধারণা রাখে না এবং এগুলো ব্যবহারে পিছিয়ে আছে।

ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে বর্তমানে এদেশে অনেকগুলো হটলাইন নম্বর পরিচালিত হচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত সকল সরকারি দপ্তরের ওয়েব সাইটের হোম পেজে ‘জরুরি হটলাইন’ শিরোনামে অনেকগুলো নম্বর প্রদর্শিত হয়। এ নম্বরগুলোর সবই কিন্তু টোল ফ্রি নয়। কোন নম্বরটিতে কী কী সেবা পাওয়া যায় তারও সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে।

সরকারি সেবা প্রাপ্তির পদ্ধতি, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য, বিভিন্ন এলাকার পর্যটনের স্থানসমূহ এবং বিভিন্ন জেলা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য রয়েছে হটলাইন নম্বর ৩৩৩। ‘সরকারি তথ্য ও সেবা সবসময়’- এ শ্লেগানে ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল চালু হয়েছে কল সেন্টার ৩৩৩। এ নম্বরে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার প্রতিকারের জন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে যেমন তথ্য প্রদান ও অভিযোগ জানানো যায়, তেমনি দুর্যোগের সময় সাহায্যের জন্য তাদের কাছে আবেদনও করা যায়। উদ্বোধনের প্রথম পাঁচ বছরে ৩৩৩ নম্বরে ৮ কোটি ৪০ লক্ষ কল এসেছে। কল সেন্টারটি ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রদান করে। প্রবাসীরাও এসব সেবা পেতে ০৯৬৬৬৭৮৯৩৩৩ নম্বরে কল করতে পারেন।

আরও পড়ুনঃ   জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়

দেশের জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর হচ্ছে ৯৯৯। যেকোনো দুর্ঘটনার মুখোমুখি হলে জরুরি সেবা পেতে দেশের যেকোনো স্থান থেকে যে কেউ টোল ফ্রি এই নম্বরে ফোন করতে পারেন। বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে এই কল সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। নম্বরটিতে ফোন করে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা কিংবা এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এ কল সেন্টার চালু থাকে। বর্তমানে এই নম্বরে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার কল করা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ঢাকা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে চালু হয়েছে হটলাইন নম্বর ১৬১৬৩। যেকোনো জরুরি সেবা গ্রহণের জন্য এই নম্বরে ফোন করা যাবে সকল অপারেটর থেকে। তথ্য প্রাপ্তির ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিস সেবা প্রদান করে থাকে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আধীন নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করছে টোল ফ্রি নম্বর ১০৯। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর প্রয়োজনীয় সকল ধরনের সেবা এবং সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা এ হটলাইনের লক্ষ্য। শিশুদের সুরক্ষায় রয়েছে আরেকটি হটলাইন ১০৯৮। শিশু কোনো ধরনের সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণের শিকার হলে শিশু নিজে অথবা অন্য যে-কোনো ব্যক্তি বিনামূল্যে ১০৯৮ হেল্পলাইনে ফোন করে সহায়তা চাইতে পারবেন। সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনসহ ২৪ ঘণ্টা এটি চালু থাকে।

দুর্নীতির তথ্য ও অভিযোগ সরাসরি জানাতে চালু রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের হটলাইন ‘১০৬’। টোল ফ্রি এই নম্বরে অফিস চলাকালীন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কল করে দুর্নীতির তথ্য জানানো যাবে।

দূর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দুর্যোগের আগাম বার্তা জানার টোল ফ্রি নম্বর হচ্ছে ১০৯০। যে-কোনো মোবাইল ফোন হতে ১০৯০ নম্বরে ডায়াল করে ১ ডায়াল করলে সমূদ্রগামী জেলেদের জন্য আবহাওয়া বার্তা; ২ ডায়াল করলে নদী বন্দরসমূহের জন্য সতর্ক সংকেত; ৩ ডায়াল করলে দৈনন্দিন আবহাওয়া বার্তা; ৪ ডায়াল করলে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্ক সংকেত; ৫ ডায়াল করলে দেশের বন্যা তথা বিভিন্ন নদ/নদীর পানি হ্রাস-বৃদ্ধির অবস্থা সম্পর্কিত তথ্য অবহিত হওয়া যাবে।

১৬১২২ নম্বরে কল করে ভূমি সম্পর্কিত আইনি পরামর্শ এবং বিভিন্ন ধরনের ভূমিসেবা যেমন ই-নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর ইত্যাদি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। এছাড়া, অভিজ্ঞ ভূমি বিশেষজ্ঞ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ ভূমি পরামর্শ দেবেন। বিদেশ থেকে +৮৮০ ৯৬১২৩ ১৬১২২ নম্বরে কল করে যেকোনো ধরনের ভূমিসেবা পেতে, কিংবা অভিযোগ জানাতে পারবেন নাগরিকরা।

আরও পড়ুনঃ   হাওরের উন্নয়নে কাজ করতে হবে

দেশের অভ্যন্তরে ১৬৪৪৫ নম্বরে এবং বিদেশ থেকে ০৯৬৬৬৭১৬৪৪৫ নম্বরে কল করলে পাসপোর্ট সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য মিলবে। এতে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট, মেশিন রিডেবল ভিসা ও ই-পাসপোর্টের আবেদনসংক্রান্ত বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাবেন সেবাপ্রার্থীরা। কল সেন্টার খোলা থাকে সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা।

বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা/মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যগণ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট হতে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার তথ্য অফিস চলাকালীন সময়ে ১৬১৭১ এ যোগাযোগ করে জানতে পারবেন।

প্রবাসী কর্মচারীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও ঋণ সহায়তাসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রদান, বিভিন্ন সমস্যা সমাধান এবং প্রবাসী কর্মচারী ও তাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে টোল ফ্রি নম্বর ১৬১৩৫ চালু রয়েছে। এছাড়া এই পরিষেবাটি বিদেশে থাকা ব্যক্তিরা পাবেন +৮৮০৯৬১০১০২০৩০ নম্বরে। ই-জিপি হেল্পলাইন নম্বর ১৬৫৭৫।
বিদ্যমান টেলিযোগাযোগ সেবাসংক্রান্ত যে-কোনো অভিযোগ প্রাপ্তির লক্ষ্যে বিটিআরসি গ্রাহক অভিযোগ হটলাইন ১০০ চালু করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সেবাসংক্রান্ত যে-কোনো অভিযোগ প্রাপ্তির লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ গ্রাহক অভিযোগ হটলাইন ১৬৯৯৯ চালু করেছে। এ নম্বরগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে।

মাদক ব্যবসায়ী সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রদান ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়মিত সেবা গ্রহণের জন্য চালু রয়েছে হটলাইন নম্বর ০১৯০৮৮৮৮৮৮৮। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের পরিষেবাসংক্রান্ত প্রশ্ন এবং অন্যান্য জরুরি তথ্যের জন্য ১৬১১৩ চালু করেছে। বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের সেবা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য পাওয়ার হটলাইন নাম্বার ১৬১০৯; যা অফিস চলাকালীন সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা থেকে। এর বাইরেও আরো কিছু হটলাইন চালু আছে।

হটলাইনগুলোতে পাওয়া কলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটা বড় সংখ্যক মানুষ অপ্রয়োজনে বিরক্তিকর কল করছে, মিথ্যা বা উদ্ভট তথ্য দিচ্ছে, মিসড কল করছে, কল করে কথা বলে না। সরকার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে হটলাইন নম্বরগুলো চালু করেছে। অপ্রয়োজনে এ নম্বরগুলো ব্যস্ত রাখলে প্রকৃতপক্ষে যার সেবা বা সাহায্য প্রয়োজন তিনি তা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই সকলের নিকট প্রত্যাশা-আমরা হটলাইন নম্বরগুলো প্রকৃত প্রয়োজনে ব্যবহার করব এবং অন্যকেও তা ব্যবহারে উৎসাহিত করব।-লেখক : উপপ্রধান তথ্য অফিসার
আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী।
-পিআইডি, রাজশাহী