পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণার নাম রুমকী

নওগাঁ প্রতিনিধি: এক সময় রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত জেলার রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার পিছিয়ে পড়া নারীদের কাছে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণার নাম হচ্ছে ১নং খট্টেশ্বর রাণীনগর ইউপি চেয়ারম্যান মোছা. চন্দনা সারমিন রুমকি। তিনিই প্রথম নারী চেয়ারম্যান হিসেবে রাণীনগর উপজেলার ইতিহাসে নিজের নাম উজ্জ্বল করেছেন।

রুমকী রাণীনগরের লোহাচুড়া গ্রামের গোলাম হোসেন আকন্দ ও গৃহিণী নিলুফা সুলতানার একটি সাধারণ পরিবারে ১৯৮২ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই লাজুক, শান্তশিষ্ট ও পরোপকারী সৎ স্বভাবের জন্য সকলের কাছে প্রিয় ছিলেন রুমকী। কৈশোরে জীবনের সংজ্ঞা ভালো ভাবে বুঝে ওঠার আগেই ১৯৯৭ সালে ঢুকতে হয়েছে সংসার জীবনে। যখন তার বয়স ৩৫ বছর তখন ২০১৯ সালে স্বামী গোলাম মোস্তফাকে হারানোর পর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় রুমকির সংসার। রুমকীর বড় মেয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে আর ছোট মেয়ে প্রাথমিকে পড়ালেখা করছে।

তৎকালীন সময়ে সর্বহারা নামক সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে প্রকাশ্যে দিবালোকে ২০০০সালে জবাই হন রুমকির স্বামীর মেজো ভাই ও তৎকালীন উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম। এভাবে সর্বহারাদের সন্ত্রাসী চাহিদা যদি কেউ পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে তখনই তাকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। সর্বহারাদের সন্ত্রাসী তান্ডব বন্ধ করতে বিগত চারদলীয় জোট সরকার জেএমবি নামক আরেক সন্ত্রাসী বাহিনীর আর্বিভাব ঘটায়।

এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন “বাংলাভাই”। বাংলাভাইয়ের নেতৃত্বে নতুন করে শুরু হয় আরেক সন্ত্রাসী বাহিনীর কর্মকান্ড। সর্বহারা দলের নেতাদের প্রকাশ্যে মারপিট করে মেরে ফেলে গাছে ঝুলিয়ে রাখা, লুটপাট করাসহ বিভিন্ন জঙ্গী কর্মকান্ড চালাতে থাকলে বর্তমান সরকার ২০০৯সালে ক্ষমতায় এলে সেই রক্তাক্ত জনপদে নতুন করে বইতে শুরু করে শান্তির সুবাতাস।
চন্দনা শারমিন রুমকী বলেন

আরও পড়ুনঃ   বগুড়া জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

আমার স্বামী গোলাম মোস্তফা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। আমার স্বামীর স্বপ্ন ছিলো তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়ে জনগনের সেবা করবেন এবং সদর ইউনিয়নকে একটি মডেল পরিষদ হিসেবে গড়ে তুলবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন তার পূরণ হয়নি। ২০১৯সালে স্টোক করে মারা যান আমার স্বামী।

এরপর ২০১৯ সালে অপরাজিতা সদস্য হলেও তিনি রাজনৈতিক চাপে অনিয়মিত হয়ে পরেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২০২০সালে তৎকালীন সাংসদ ইসরাফিল আলমের মৃত্যু হলে উপনির্বাচনে নতুন সাংসদ নির্বাচিত হন রুমকী’র ভাসুর (স্বামীর বড় ভাই) আলহাজ্ব মো. আনোয়ার হোসেন হেলাল। বদলে যায় রাজনৈতিক দৃশ্যপট। আবার চন্দনা সারমিন রুমকী অপরাজিতা সভায় নিয়মিত হতে থাকেন। অপরাজিতা প্রকল্প তাকে স্বপ্ন দেখতে শেখায় যে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার। অপরাজিতা প্রকল্পের পরামর্শের কথা তিনি মাননীয় সাংসদ কে জানালে সাংসদ অপরাজিতা কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং জনসংযোগ সৃষ্টির জন্য অপরাজিতা প্রকল্পের সকল ইভেন্টে রুমকীকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ প্রদান করেন।

রুমকীর স্বামী গোলাম মোস্তফা উপজেলায় একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হওয়ায় পরবর্তিতে ২০২২সালে ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন অংশগ্রহণ করায় মানুষ তাকে “সহানুভূতি ও শ্রদ্ধায়” ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। নির্বাচনের ২মাস পরে উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। ইউনিয়নের সকল স্থায়ী কমিটি পুন: গঠন করেছেন এবং অপরাজিতা সদস্যদের স্থায়ী কমিটিতে অর্ন্তভূক্ত করেছেন।

তিনি নানা প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন একজন মানুষ হিসেবে। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে হাত বাড়িয়েছেন সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের উন্নয়নের জন্য। উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সফল হবেন এটাই তার অদম্য বিশ্বাস। সমাজের নির্যাতিত ও পিছিয়ে পড়া নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্তর স্থাপন করতে চান রুমকী। একসময় মানুষের অনেক গালমন্দ সহ্য করতে হয়েছে রুমকীকে। মানুষের সকল সমালোচনাকে পেছনে ফেলে নিজের পরিবারের সদস্য ও ইউনিয়নবাসীদের সহযোগিতায় তার স্বামীর রেখে যাওয়া স্বপ্ন পূরণে কাজ করতে পারছেন বলেই তিনি নিজেকে সফল মনে করছেন।

আরও পড়ুনঃ   সাড়ে তিন বছরের শিশুর সঙ্গে এ কেমন নির্মমতা

তার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেতে অপরাজিতা প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি আরো বলেন যে,“আমার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে অপরাজিতা প্রকল্প উৎসাহ, সাহস, তথ্য সহায়তা, নমিনেশন পাওয়ার ক্ষেত্রে এ্যাডভোকেসীসহ প্রচার-প্রচারনায় ব্যাপক সহায়তা করেছে, অপরাজিতা প্রকল্পের স্বপ্নই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে। অপরাজিতা প্রকল্পের সংস্পর্শে এসে প্রশিক্ষণে পাওয়া জ্ঞান-দক্ষতাকে পুঁজি করে পিছিয়ে পড়া নারীদের ভাগ্যোন্নয়নের স্বপ্ন দেখছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় ইউনিয়নের প্রায় ০৩টি ব্যাচে ৬০জন নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন। প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় শতাধিক নারী এই শিক্ষাকে পুঁজি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন।

মানুষের দ্বারে দ্বারে সকাল-সন্ধ্যা ছুটে চলেছেন সকলের প্রিয় “রুমকী আপা”। নিজে থেকেই খোঁজ নিচ্ছেন এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের। তিনি স্বপ্ন দেখেন সমতার সমাজ শীঘ্রই প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে নারী-পুরুষ সমান আত্ম-বিকাশের সুযোগ পাবে। চলমান পুরুষতান্ত্রিকতার পরিবর্তে গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক নতুন সমাজ ব্যবস্থা। এক সময় সমাজের প্রতিটি নির্যাতিত ও অবহেলিত পিছিয়ে পড়া নারীরা অনুপ্রেরণা হিসেবে রুমকীকে অনুসরণ করে সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে এমনটাই প্রত্যাশা করেন চন্দনা সারমিন রুমকী।